ত্বকের ধরন বোঝার উপায়

ত্বক হচ্ছে মেরুদন্ডী প্রাণীর বহিরাঙ্গিক একটি অংশ যা প্রকৃতপক্ষে একটি নরম আবরণ এবং দেহকে আবৃত করে রাখে।

এটি প্রাণিদের ভিতরের অংশগুলোকে রক্ষা করে। স্তন্যপায়ীদের ত্বকে লোম বা ছোট চুল থাকে। ত্বক পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে সংযোগ স্থাপন করে এবং বাহ্যিক প্রভাবের বিরুদ্ধে এটি দেহের প্রাথমিক রক্ষক।

রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে ও শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি অপসারণ প্রতিরোধে ত্বক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া অন্তরক, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক, ইন্দ্রিয় ও ভিটামিন ডি উৎপাদক হিসেবে ত্বক কাজ করে।

ত্বকের পুরুত্ব প্রাণীভেদে এবং একই প্রাণীতে অবস্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। মানুষের চোখের পাতার ত্বক সবচেয়ে পাতলা আর হাত-পায়ের তালুর ত্বক সবচেয়ে পুরু।

ত্বকের ধরণ বোঝার উপায় কি?

এ প্রশ্ন আমরা প্রায় শুনে থাকি। সাধারণত ৫ ধরনের ত্বক আমরা দেখে থাকি। 

  • সাধারণ (Normal)
  • শুষ্ক (Dry)
  • তৈলাক্ত (Oily) 
  • এবং সংবেদনশীল (Sensitive)

কিছু মানুষের আবার মিশ্র ত্বক (Combination Skin)-ও থাকতে পারে। সময়ের সাথে সাথে আবার ত্বকের ধরন বদলে যায়।

যেমন: তরুন তরুণীদের ত্বক বয়স্কদের তুলনায় অনেকাংশে নরমাল হয়ে থাকে।

ত্বকের ধরন বোঝার উপায় নিয়ে জানার পূর্বে জেনে নিন যে ত্বকের ধরন কেমন হতে পারে তা নির্ভর করে কিছু বৈশিষ্ট্যের উপর।

যেমন: ওয়াটার কনটেন্ট যা ত্বকের কোমলতা নষ্ট করবে, অয়েল কনটেন্ট যা ত্বকে আটকাবে

এবং সেনসিটিভ লেভেল যার কারণে চর্ম রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে

সাধারণ ত্বক বা নরমাল স্কিন

সাধারণ ত্বকের খুব বেশি শুষ্ক নয় আবার খুব বেশি তৈলাক্ত নয়। কিছু ইম্পেরফেকশান থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে।

খুব বেশি সেনসিটিভ হবে না। অল্প বিস্তর দাগ থাকতে পারে।

খুব বেশি উজ্জ্বল হবে না। সাধারণত এগুলোই হচ্ছে সাধারণ ত্বকের বৈশিষ্ট্য।

স্বাভাবিক ত্বকে টিস্যু চেপে ধরলে খুব অল্প তেলতেলে ভাব লক্ষ্য করা যাবে।

ঘাম, ধুলা ধুয়ে ফেলতে দিনের মধ্যে তিনবার অন্তত পানি দিয়ে চেহারা পরিষ্কার করে ফলেতে পারেন। পানি পান করতে হবে বেশি করে।

শুষ্ক ত্বক বা ড্রাই স্কিন

শুষ্ক ত্বক কিছুটা রুক্ষ থাকে। কিছু কিছু জায়গায় বলিরেখা দেখা যায়।

ত্বক ফেটে যাওয়া, চামড়া ওঠা, জ্বালা পোড়া, চুলকানো, চামড়া ফুলে যাওয়া এ ধরনের সমস্যা হতে পারে।

যদি আপনার ত্বকের ধরন শুষ্ক হয়ে থাকে তাহলে আপনার হাত, পা, কনুই এবং মাথার স্কাল্প অতিরিক্ত মাত্রায় শুষ্ক থাকবে।

শুষ্ক ত্বকে টিস্যু চেপে ধরলে কোনো ধরনেরই তেলতেলে ভাব লক্ষ্য করা যায় না।

ত্বকের ছিদ্রগুলো বড় থাকে, চুলকায়—শুষ্ক ত্বক এমনই। বেশি ঘষামাজা করতে গেলে আবার কুঁচকে যায়।

সঙ্গে ত্বকের রুক্ষতা তো আছেই। এমন কিছু সমস্যা নিয়েই চলতে হয় শুষ্ক ত্বকের অধিকারীদের।

আমরা দেখলে বলি ত্বকের যত্ন নেয় না, তাই ত্বকের এই অবস্থা। এটা বুঝতে পারি না যে ত্বকের ধরনটাই শুষ্ক।

শুষ্ক ত্বক বিভিন্ন কারণে হতে পারে অথবা জন্মগত ভাবেও হতে পারে।

যেমন: হরমোন অথবা বয়সের কারণে।

আবহাওয়ার পরিবর্তন (শীত/ রোদ/ বৃষ্টি), আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি, ঘরের অভ্যন্তরীণ উত্তাপ, অনেক সময় নিয়ে গরম পানিতে গোসল, অতিরিক্ত ওষুধ সেবন।

শুষ্ক ত্বকের যত্ন নিতে কিছু বেসিক টিপস ফলো করা যেতে পারে।

যেমন: দৈনিক এক বারের বেশি গোসল করা উচিত না। সাবান ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।

মাইল্ড অ্যান্ড জেন্টেল সোপ ব্যবহার করুন, ডিওডরেন্ট সাবান পরিহার করুন।

ত্বকের যে জায়গা বেশি শুষ্ক সেখানে স্ক্রাব ব্যবহার করবেন না। গোসলের পর পর ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

লোশন এর চেয়ে ক্রিম অথবা অয়েনমেন্ট দিলে ভালো। ঘরের আর্দ্রতা বজায় থাকলে ভালো, খুব বেশি উত্তাপ যেন না হয়।

ঘরের কাজের জন্য ডিটারজেন্ট ব্যবহার করার আগে গ্লাভস পড়ুন।

তৈলাক্ত ত্বক বা অয়েলি স্কিন

তৈলাক্ত ত্বকে ক্ষেত্রে কপাল, নাকের ভাঁজ, চিবুক এবং গালের অধিকাংশ অংশেই তেলতেলে ভাব থাকে।

ব্ল্যাকহেডস, ব্রণ অথবা কিছু খুঁত হতে পারে, ত্বকে বড় বড় গর্ত তৈরি হতে পারে। তাই এই ধরনের ত্বক সনাক্ত করা যায় সহজেই।

গায়ের রঙ ঘন উজ্জ্বল কিন্তু নিষ্প্রাণ হয়ে যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে টিস্যুতে আপনার মুখের পুরো তৈলাক্ত ভাব উঠে আসলে বুঝতে হবে আপনার ত্বক তৈলাক্ত। 

সময়ের সাথে সাথে তৈলাক্ত ভাব কমে যেতে পারে। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে স্কিন টোনেও পরিবর্তন আসতে পারে।

তৈলাক্ত ত্বক অনেক কারণে হতে পারে। হরমোনাল ইম্ব্যালেন্স, উচ্চ রক্তচাপ বা দুশ্চিন্তা করা, প্রখর রোদ অথবা অতিরিক্ত আর্দ্রতা।

ব্রণ হলে নখ দিয়ে খোঁটা যাবে না। এতে সংক্রমণ হয়ে যায়। এছাড়া শসার রস দিয়ে চেহারা পরিষ্কার করতে পারেন।

নিম পাতার পানি জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করে ফ্রিজে রেখে দিন। সময়মতো তুলোয় নিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন।

এতে করে তেল নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অতিরিক্ত ঘামলে ২ বার করে গোসল করতে পারেন কিন্তু এর বেশি নয়।

জেন্টেল ক্লিনজার ব্যবহার করুন স্ক্রাব এর পরিবর্তে। ব্রণ খুঁটিয়ে তুলবেন না।

যে প্রোডাক্ট ব্যবহার করছেন তার গায়ে “non-comedogenic” লেখা দেখে নিন। এই ধরনের ক্রিম গর্ত রোধ করে।

সংবেদনশীল ত্বক বা সেনসিটিভ স্কিন

যদি আপনার স্কিন সেনসিটিভ হয়ে থাকে তাহলে আপনি সমস্যা গুলো খুঁজে বের করুন যেগুলো আপনি সহজে দূর করতে পারেন।

বিভিন্ন কারণে স্কিন সেনসিটিভ হয়ে থাকে তবে বেশিরভাগ সময়ই আপনি না জেনে যে স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার করছেন সেগুলো দায়ী।

শুষ্কতা, লালচে ভাব, চুলকানি, জ্বালা পোড়া, ব্রণ, একনে, র‍্যাশ প্রবলেম… এ ধরনের সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে।

মিশ্র ত্বক বা কম্বিনেশন স্কিন

মিশ্র ত্বক কিছুটা শুষ্ক, কিছুটা স্বাভাবিক এবং কিছু তৈলাক্ত ধরনের হয়।

টিস্যু পেপারে যদি শুধু আপনার (নাক, কপাল ও চিবুক/থুতনি) থেকে তেল উঠে আসে তাহলে বুঝতে হবে আপনার ত্বকের ধরণ মিশ্র।

মিশ্র ত্বক থাকার ফলে তাদের কিছু বিশেষ যত্ন নেয়ার প্রয়োজন হয়।

সাধারণ যে ধরনের সমস্যাগুলো মিশ্র ত্বকে হতে পারে, যেমন: খালি চোখে অদৃশ্য কিছু গর্ত, ব্ল্যাকহেডস, অতিরিক্ত উজ্জ্বলতা।

আপনার ত্বক যে ধরণেরই হোক না কেন, কিছু পরামর্শ মেনে চলা খুবই জরুরি।

যেমন: UVA & UVB রশ্মি প্রতিরোধ করে এমন সানস্ক্রিন ক্রিম/লোশন ব্যবহার করুন। রোদে হ্যাট অথবা সানগ্লাস ব্যবহার করুন।

ধূমপান/নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকুন। অবশ্যই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

ঘুমানোর আগে অবশ্যই মেকআপ তুলুন।

ত্বকের ধরণ বোঝার উপায় ও এর যত্নে কী করনীয় তা কিছুটা হলেও জানতে পেরেছেন।

তাই নিজেই থেকেই নিজের ত্বকের ধরণ বোঝার চেষ্টা করুন, সুস্থ থাকুন।